By মোহা. মোস্তাফিজুর রহমান
নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের প্রতি জেন্ডারভিত্তিক বুলিংয়ের ধরন
Media School March 16, 2026
সমাজ এখনো একজন নারীর স্বাধীনভাবে অর্থ উপার্জন এমনকি ভার্চুয়াল জগতে বিচরণকেও সহজভাবে নিতে পারে না।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্য আত্মপ্রকাশ ও স্বনির্ভরতার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। নওরীন আফরোজ পিয়া, ফারহানা বিথি, মুসতারিন সুলতানা, রেকলেস রাইডার সুমাইয়া, বারিশা হক, রুবায়েত ফাতিমা তনি বা মাহতাস মেরিনের মতো নারী ক্রিয়েটররা বহু মানুষের কাছে পরিচিত। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার আড়ালে তাদের প্রতিনিয়ত শিকার হতে হয় ‘জেন্ডারভিত্তিক সাইবার বুলিং’-এর। শুধু নারী হওয়ার কারণে তাদের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, চরিত্রহনন ও মানসিক হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে।
বিভিন্ন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের প্রোফাইল ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের কাজের মান বা বিষয়বস্তুর চেয়ে দর্শকদের বড় একটি অংশের নজর থাকে তাদের পোশাক, শারীরিক গঠন এবং ব্যক্তিগত জীবনের ওপর।
সার্বিকভাবে মন্তব্যের বিষয় বা ধরনগুলোর দিকে একটু নজর দেওয়া যাক :
• শারীরিক গঠন নিয়ে কটাক্ষ (Body Shaming): প্রায় সব নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে তাদের কনটেন্টের চেয়ে বেশি কটাক্ষ শুনতে হয় শারীরিক গঠন নিয়ে। শারমিন শিলার ‘ভূতের রানী’ বা ‘পাগলি’, রুবায়েত ফাতিমা তনিকে ‘পাঙ্গাস মুখি’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আবার ফারহানা বিথিকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, ‘হেতির মুখ হইছে বাঁশের মতন, আর দাঁত হইছে গণ্ডারের মতো’। এভাবে কটাক্ষ করার মাধ্যমে মূলত তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
• পোশাক ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন : যেসব নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিজাব ছাড়া কনটেন্ট করেন তাদের পোশাক নিয়ে অসংবেদনশীল মন্তব্য করতে দেখা গেছে উদ্বেগজনক হারে। আবার যারা হিজাব পড়ে কনটেন্ট করেন তারাও রেহাই পাননি। অর্থাৎ পোশাক যেমনই হোক, সবকিছুতেই তাদের ‘নষ্টা’ বা ‘অশ্লীল’ তকমা দেওয়া হয়।
• সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা : একজন নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটর যখন তার উপার্জনে আইফোন কেনেন বা গাড়ি কেনেন, তখন নেটিজেনরা সেটাকে সন্দেহের চোখে দেখে। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ চায় নারীরা ঘরে থাকুক, তাদের চাকরি বা কাজ করতে দিতে চায় না। ফলে, কোনো নারী আর্থিকভাবে স্বাবলম্বি হলে তার চরিত্র নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়। তাদের ‘দেহ ব্যবসায়ী’, ‘নর্তকী’, ‘বেশ্যা’ বা ‘মাগি’ - এসব গালমন্দ প্রতিনিয়তই শুনতে হয়। কমেন্টে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে তিনি ‘অসৎ’ পথে এসব অর্জন করেছেন।
• নারী বনাম নারী : তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বুলিংয়ের এই মিছিলে কেবল পুরুষরাই নয়, নারীরাও সমানভাবে শামিল। অনেক নারী ফলোয়ারকেও নোংরা ভাষায় কমেন্ট করতে দেখা গেছে। যেমন : ‘যে যত বেশি কাপড় খুলবে, সে তত ফেমাস হবে’। একজন নারীর প্রতি আরেকজন নারীর এমন বিদ্বেষ মূলত পুরুষতান্ত্রিক চিন্তারই প্রভাব। এই নারীরাও সেই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারা ধারণ করেন। আবার কেউ কেউ নিজে বঞ্চিত হওয়ার কারণে অন্যদের সাফল্য মেনে নিতে পারেন না। তবে তাদের এমন মন্তব্য একজন নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে মানসিকভাবে আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।
• বট/ফেইক আইডি : অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু ‘বট’ বা ফেইক আইডি (যেমন : ‘অচিনপুরের রাজকন্যা’, ‘আজরাইল’, ‘ব্যাম্বু প্রোভাইডার’, ‘রাকিবের বউ’ ইত্যাদি) ব্যবহার করে নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের পোস্টে নোংরা মন্তব্য করা হয়। তারা যেকোনো ভিডিওর নিচে গণহারে নোংরা মন্তব্য করে। তারা মনে করে, প্রোফাইল ফটোহীন বা ফেইক ফটো দিয়ে করা এসব অ্যাকাউন্টের পেছনে কে আছে তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই তারা পরিচয় গোপন করে আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
কেন এই নোংরা মানসিকতা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বুলিংয়ের পেছনে বেশকিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে :
১. পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি : সমাজ এখনো একজন নারীর স্বাধীনভাবে অর্থ উপার্জন এমনকি ভার্চুয়াল জগতে বিচরণকেও সহজভাবে নিতে পারে না। এ কারণে সফল নারী উদ্যোক্তা এমনকি নারী রাইডারকেও অনেক কটু কথা শুনতে হয়। অথচ পুরুষ ক্রিয়েটরেরা একই কাজ করলে সাধারণত এই ধরনের যৌন-আক্রমণাত্মক মন্তব্যের শিকার হন না।
২. জবাবদিহিতার অভাব : ফেইক আইডি খুলে খুব সহজেই কাউকে গালি দেওয়া হচ্ছে। এর জন্য তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তির ভয় থাকে না। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে এসব আইডি চিহ্নিত করে তা বন্ধ করার উদ্যোগও নেওয়ার নজিরও কম। ফলে, এমন ব্যক্তিরা দিনের পর দিন এসব অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
৩. বিকৃত মানসিক বিনোদন : অন্যের চরিত্রহনন করে বা কাউকে ছোট করে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পাওয়ার প্রবণতা নেটিজেনদের মধ্যে বাড়ছে। পছন্দ না হলে তারা চাইলে যে-কাউকে আনফলো করতে পারে। কিন্তু তারা তা না করে শুধু গালি দেওয়ার জন্য কনটেন্ট দেখে এবং অশালীন মন্তব্য করতে থাকে।
প্রতিকারের উপায়
• আইনি কঠোরতা : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার অপরাধ দমন আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যারা ‘লিংক পাওয়া গেছে’ বা চরিত্রহননকারী পোস্ট দেয়, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
• সামাজিক সচেতনতা : পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিজিটাল লিটারেসি বা অনলাইন শিষ্টাচার শেখাতে হবে।
• অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা : ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবকে বাংলায় করা গালি বা বুলিং শনাক্ত করার প্রযুক্তি আরও উন্নত করতে হবে এবং রিপোর্টের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
• পাল্টা প্রতিরোধ : ক্রিয়েটরদের উচিত বুলিংকে গুরুত্ব না দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং মানসিকভাবে শক্ত থাকা। পাশাপাশি সাধারণ দর্শকদের উচিত ইতিবাচক মন্তব্য করা।
উপসংহার
নারীবিদ্বেষী বুলিং কেবল একজন নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ক্ষতি করছে না, বরং সামগ্রিকভাবে অনলাইন স্পেসে নারীদের অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে। সুস্থ ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি নেটিজেনদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। অনলাইন জগত হোক সবার জন্য নিরাপদ - লিঙ্গ নির্বিশেষে এই অধিকারটুকু নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
মোহা. মোস্তাফিজুর রহমান : প্রভাষক - জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়।

