Media School

Dhaka    Tuesday, 10 March 2026

By মোহা. মোস্তাফিজুর রহমান

ম্যাডোনা বনাম পতিতা দ্বিধাবিভক্তি

Media School March 8, 2026

ছবি: ফ্রাঙ্ক পেপে। উৎস: keithwilsoncounseling.com

ম্যাডোনা-হোর ডাইকোটমি (Madonna-Whore Dichotomy) হলো একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক ধারণা, যেখানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে কেবল দুটি চরম ও বিপরীত মেরুতে ভাগ করে দেখা হয়:

১. ম্যাডোনা: কুমারী মেরি বা আদর্শ মা। তিনি পবিত্র, নিষ্পাপ, যৌনতাহীন ও ত্যাগের প্রতীক।

২. হোর: পতিতা বা যৌনকর্মী। যিনি কামুক, অবাধ্য, বিপজ্জনক ও শুধুই যৌন লালসার বস্তু।

১৯০০-এর দশকের শুরুর দিকে মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Freud) এই ধারণার প্রবর্তন করেন। তাঁর মতে, অনেক পুরুষ নারীকে মাত্র দুইভাবে দেখে। যে নারীকে তারা শ্রদ্ধা করে, পবিত্র বা ‘মাতৃতুল্য’মনে করে তার প্রতি কোনো যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন না। বিপরীতে যাকে সে যৌনভাবে কামনা করে তাকে শ্রদ্ধা করতে পারে না বা তাকে ‘অপবিত্র’ মনে করে।

বৈশিষ্ট্যসমূহ:

এই দ্বৈতবাদী চিন্তাধারার কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য আছে যা সমাজে নারীর অবস্থানকে সংকুচিত করে। এগুলো নিম্নরূপ-

  • মেরুকরণ (Polarization): নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার বদলে তাকে হয় ‘দেবী’ অথবা ‘দাসী’ বা ‘খারাপ নারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মাঝে কোনো স্বাভাবিক মানুষের অবস্থান নেই।
  • যৌনতাকে অস্বীকার: ধরে নেওয়া হয় একজন ‘ভালো নারী’ বা ‘ম্যাডোনা’র কোনো যৌন ইচ্ছা থাকতে পারবে না। তার যৌনতা কেবল সন্তান জন্মদানের জন্য সংরক্ষিত।
  • মর্যাদা বনাম পণ্য:ম্যাডোনা’-কে ঘরে আটকে রেখে সম্মান দেওয়া হয়। আর হোর হিসেবে চিহ্নিত নারীকে ঘরের বাইরে পণ্য হিসেবে দেখা হয় এবং তাদের প্রকাশ্যে অসম্মানিত করা যেতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়।
  • পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ: এই বিভাজন পুরুষকে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে সাহায্য করে। নারী যদি পুরুষের বেঁধে দেওয়া পবিত্র মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত হয়, তবে তাকে পতিতা/বেশ্যা/বাজে মেয়ে’ এসব তকমা দিয়ে সমাজচ্যুত করা যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে এই ডাইকোটমি বা দ্বৈতবাদ অত্যন্ত প্রকট। এর কিছু বাস্তব চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

ক) পোশাকের মাধ্যমে বিচার

যদি কোনো নারী শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ পরেন এবং মাথায় হিজাব বা ওড়না দেন, সমাজ তাকে ভাল মেয়ে বা ম্যাডোনা ইমেজে দেখে। কিন্তু একই নারী যদি পশ্চিমা পোশাক (যেমন: জিন্স বা টপস) পরেন, তবে তাকে উচ্ছৃঙ্খল বা চরিত্রহীন (Whore) হিসেবে তকমা দেওয়া হয়।

খ) প্রেমের সম্পর্ক বনাম বিয়ে

আমাদের সমাজে অনেক পুরুষ এমন নারীর সাথে প্রেম করতে চায় যে আধুনিক ও স্মার্ট। এক্ষেত্রে মূলত তাদের সেক্সুয়াল অবজেক্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে সে চায় একজন সংসারীকুমারী মেয়েকে।

গ) কর্মজীবী নারী ও রাতে ডিউটি

যদি কোনো নারী পেশাগত কারণে রাতে বাইরে থাকেন বা একা চলাফেরা করেন, সমাজ তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। পেশাদারিত্বের চেয়ে তার চরিত্র নিয়ে আলোচনা বেশি হয়। এখানে রাত জাগা নারী মানেই তাকে ম্যাডোনা ইমেজের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়।

ঘ) মিডিয়ায় চিত্রায়ণ

বাংলা নাটক বা সিনেমায় দেখা যায় যে, মা বা আদর্শ স্ত্রী (ম্যাডোনা) চরিত্রে যারা থাকেন, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাদা বা হালকা রঙের পোশাক পরেন। তারা খুবই ইমোশনাল হন। তাদের ‘বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না’; তারা সব দুঃখ-অপ্রাপ্তি সয়ে যান। অন্যদিকে, যে নারীকে স্বাধীনচেতা বা নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়, তার মুখে থাকে কড়া মেকআপ; পোশাকে তাকে ‘আধুনিক’, ভ্যাম্প বা খারাপ নারী হিসেবে দেখানো হয়।

 

প্রভাব ও সমালোচনা

পুরুষের তথা সমাজের এই ধরনের মানসিকতা নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং জেন্ডার বৈষম্যকে উসকে দেয়। নারীবাদী তাত্ত্বিকরা মনে করেন, এই বিভাজন দূর না হওয়া পর্যন্ত নারীর পূর্ণ স্বাধীনতা অসম্ভব। কারণ এটি নারীকে তাঁর নিজের শরীরের ওপর অধিকার এবং নিজের ইচ্ছামতো বেঁচে থাকার পথে বাধা সৃষ্টি করে। নারীবাদীরা মনে করেন, এই ডাইকোটমি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক অস্ত্র।

রিলেশনাল আইডেন্টিটি (Relational Identity): পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতিতে নারী কোনো স্বাধীন ব্যক্তি (Individual) নয়। সে সবসময় ‘কারও মেয়ে, কারও বোন বা কারও স্ত্রী। এই পরিচয়ের কারণেই তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত, যেমন: কোনো ক্লাবে নাচ করা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা এসবকেও পাবলিক প্রোপার্টি বানিয়ে ফেলা হয়। তাকে সমালোচিত করা বা আঘাত করা মানে তার সাথে সম্পৃক্ত পুরুষটিকে সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করা।

কনটেক্সচুয়াল এজেন্সি (Contextual Agency): মানুষ বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। একজন পুরুষ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠনে একরকম আর বন্ধুদের আড্ডায় আরেকরকম হলে তাকে স্মার্ট বলা হয়। কিন্তু নারী যখন ধর্মীয় আবহে ওড়না পরে এবং ব্যক্তিগত পরিসরে পশ্চিমা পোশাক পরে, তখন তাকে খারাপ বলা হয়। এটিই হলো Gendered Double Standard

ডিজিটাল অনার পুলিশিং (Digital Honour Policing): বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে নারীর চরিত্র হরণ করা যায় খুব সহজে। একে বলা হয় Surveillance বা নজরদারি। লজ্জাকে এখানে ধর্মের চেয়ে বেশি শাসনের হাতিয়ার (Tool of Governance) হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছু উদাহরণ

২০২৬ সালে জাইমা রহমানের ক্লাবে নাচের একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ম্যাডোনা বনাম পতিতা দ্বিধাবিভক্তি বা ডাইকোটমির প্রকট উদাহরণ। সেখানে এই ঘটনাকে জাতীয় লজ্জা হিসেবে তুলে ধরতে দেখা গেছে। অথচ এটি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। তিনি ইংল্যান্ডে বড় হয়েছেন যেখানে clubbing-কে সাধারণ সামাজিক জীবন হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

এটি বাংলাদেশের রাজনীতির পুরোনো ফর্মুলা; পুরুষের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নারীর শরীরকে অস্ত্র বানানো হয়। কারণ, জাইমা নির্বাচিত প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা বা কোনো নীতিনির্ধারকও নন; কিন্তু তিনি একজন রাজনৈতিক নেতার কন্যা এই পরিচয়ই তাকে public property বানিয়ে ফেলেছে। তাকে আঘাত করার মাধ্যমে আসলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করা হয়েছে। এটি এক ধরনের ‘Gendered Political Violence’। একইভাবে আমরা দেখেছি শেখ হাসিনার নাতনির পোশাক ও তার ট্যাটু নিয়ে বিভিন্নজনকে কুৎসিত মন্তব্য করতে।

এর আগে বেগম খালেদা জিয়ার শাড়ি, চুল, ভ্রু নিয়েও নানান কথা হতো। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টো বা ভারতের ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়েও নানা ধরনের ট্রলিং সবই একই মেকানিজম থেকে আসে।

এই বাইনারির ভেতরে শুধু সংস্কৃতি না, খুব স্পষ্টভাবে ধর্মও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তা করা হয় রাজনৈতিক সুবিধার জন্য। এখানে যতটা না ধর্মবিশ্বাসের জায়গা আছে, তার চেয়ে বেশি আছে ধর্মের প্রদর্শন। অর্থাৎ, কে কখন মাথা ঢাকলো, কে কোন সময় কোন পোশাক পরলো- এই ছবিগুলোকে রাজনৈতিক ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট বানানো প্রবণতা রয়েছে।

 

ডিজিটাল মাসকুলিনিটি ক্রাইসিস (Digital Masculinity Crisis): বাংলাদেশে বর্তমানে যুবসমাজের বড় একটা অংশ বেকারত্ব বা অনিশ্চয়তার কারণে নিজেদের জীবন নিয়ে হতাশ। তাদের এই অবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণহীনতা তাদেরকে প্রতিশোধপরায়ন করে তোলে। তারা এর প্রতিশোধ নেন নারীর ওপর ডিজিটাল আধিপত্য (Micro-domination) দেখিয়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কমেন্ট সেকশনে নারীর চরিত্র নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা তাদের কাছে একটি ক্ষুদ্র জয় বা ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হয়। তারা বাস্তবে ক্ষমতাহীন, কিন্তু স্ক্রিনে শক্তিশালী! দুঃখজনক হলেও সত্য যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনেক নারীও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একইভাবে অন্য নারীদের নিয়ে ‘স্লাট শেমিং’ করেন।

 

উপসংহার

ম্যাডোনা-হোর ডাইকোটমি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, এটি নিয়ন্ত্রণের ভাষা। রাষ্ট্র ও সমাজ আইনের চেয়ে নৈতিক আদালত বসিয়ে নারীকে বিচার করতে চায়। এতে জয় হয় পুরুষতন্ত্রের। আমাদের বোঝা দরকার- জীবন একমাত্রিক নয়, বরং বহুমাত্রিক (Layered)। নারীর এই বহুমাত্রিকতাকে মেনে নেওয়াই হলো মানবিক মানসিকতা।

মোহা. মোস্তাফিজুর রহমান: প্রভাষক - জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়।